অধ্যায় ১ : ট্রেনের জানলার ধারে 🚉🌧️
লেখিকা: সুমি আক্তার
রাত গভীর হতে থাকে। দক্ষিণবঙ্গের অজপাড়াগাঁ থেকে কলকাতার পথে ছুটে চলা সেই লোকাল ট্রেনের জানালার ধারে বসে আছে মৃত্তিকা।
চোখে জমাট অশ্রু, কপালে নিভে যাওয়া সিঁদুর, শরীরে ভাঙা ভাঙা ক্লান্তি।
তার বুকটা ভার হয়ে আছে জমে থাকা দুধে।
যে শিশুটি কয়েকদিন আগে পৃথিবীর আলোয় এসেছিল—সে আজ আর নেই।
তবু দেহ মানতে পারছে না সেই শূন্যতা।
একটা মাতৃত্ব, বুকের ভেতর গোপন নদীর মতো উপচে পড়ছে, অথচ খালি, অথচ শূন্য।
লোকজনের চোখের দৃষ্টি তাকে ছুঁয়ে যায়—
কেউ করুণায়, কেউ তাচ্ছিলে, কেউ কৌতূহলে।
কিন্তু মৃত্তিকা তাকায় না কারও দিকে।
সে যেন ভেতরে ভেতরে গুটিয়ে যাচ্ছিল—যেন পৃথিবীর সমস্ত শব্দকে বন্ধ করে দিতে চাইছিল।
সামনের সিটে বসা ছেলেটি—আদর।
ভাঙা স্যান্ডেল, পুরোনো ব্যাগ, চোখে শান্ত এক স্থিরতা।
সে লক্ষ করছে মৃত্তিকাকে, কিন্তু অন্যদের মতো নয়।
তার চোখে কৌতূহল নেই, করুণা নেই—
বরং যেন এক অচেনা শ্রদ্ধা, যেন কোনো পুরোনো ক্ষতের প্রতি নীরব প্রণাম।
ট্রেন যখন হঠাৎ এক স্টেশনে দাঁড়ায়, মৃত্তিকার মাথা হেলে পড়ে।
শরীর ঘামে ভিজে, ঠোঁট শুকিয়ে গেছে।
আদর ঝাঁপিয়ে ধরে।
চারপাশে কোলাহল—
কেউ চমকে ওঠে, কেউ তাকিয়ে থাকে।
কিন্তু আদর সেই দৃষ্টি এড়িয়ে, তাকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে।
একটা নির্জন বিশ্রামাগারে তারা আশ্রয় নেয়।
বৃষ্টি গন্ধ মেশানো বাতাসে রাত তখন আরও গভীর।
মৃত্তিকা আধা অচেতন অবস্থায় শুয়ে আছে।
তার বুকটা যেন ফেটে যাচ্ছে জমে থাকা দুধের ব্যথায়।
ফিসফিস করে বলে—
“ও বেরোচ্ছে… ব্যথা করছে… সামলাতে পারছি না…”
আদর কিছুক্ষণ দ্বিধায় থাকে।
তারপর বলে—
“দিদি… আপনি চাইলে… আমি সাহায্য করতে পারি।”
শব্দগুলো ভেসে যায় ভারী রাতের নিস্তব্ধতায়।
মৃত্তিকা চোখ বন্ধ করে মুখ ফিরিয়ে নেয়।
কিন্তু থামায় না।
তার শরীরের ভাষা নীরব সম্মতির মতো।
আদর ধীরে তার আঁচল সরায়।
তারপর ঠোঁট রাখে বুকে—
না লালসায়, না তৃষ্ণায়—
শুধু এক পবিত্র স্পর্শে।
যেন বহুদিনের জমে থাকা যন্ত্রণা মুক্তির পথ খুঁজে পেল।
প্রথম চোষায় মৃত্তিকা কেঁপে ওঠে।
দ্বিতীয় চোষায় তার ঠোঁট থেকে বেরোয় এক চাপা শব্দ—
দুঃখ আর মুক্তির মাঝামাঝি এক দীর্ঘশ্বাস।
তার হাত চলে যায় ছেলেটির মাথায়।
ঠেলে দেয় না।
বরং মাথাটা আরও শক্ত করে চেপে ধরে বুকের সাথে।
বুক হালকা হতে থাকে ধীরে ধীরে।
দেহে জমে থাকা যন্ত্রণা কমে আসে।
চোখ বেয়ে অশ্রু নামে, তবে সেই অশ্রু ভিন্ন—
এবার যেন ভারমুক্তির অশ্রু।
সকাল হলে আকাশে রোদ উঠেছিল।
পাখি ডাকছিল, রেললাইনের ধারে শিশুরা দৌড়োচ্ছিল।
মৃত্তিকা ধীরে উঠে বসে।
তার চোখে ক্লান্তি আছে, কিন্তু একরকম প্রশান্তিও আছে।
সে চুপ করে বলে—
“ভাই… তুমি থেকো।
আমার সুস্থ হয়ে ওঠা অবধি…”
আদর তাকায় তার দিকে।
চোখে কিছু বলে না।
কিন্তু সেই নীরবতায় প্রতিশ্রুতি লুকানো—
এক অচেনা রক্তের বাঁধন, যা জন্মায় শুধু ভাগ্যের গোপন খেলায়।
রাতের সেই ঘটনাটা তাদের জীবনে হয়ে রইল এক অদ্ভুত বাঁক—
না প্রেম, না অবহেলা—
বরং ভাঙা মানুষ দু’জনের মাঝে গড়ে ওঠা এক অদৃশ্য সেতু।

0 Comments