সখি তুমি মোর হারিয়ে যাওয়া প্রেম
পর্বঃ ২
✍️ Sumi Akhtar
ঘরের ভেতর শীতল বাতাস বয়ে যাচ্ছে, অথচ কারো শরীরের মধ্যে এক বিন্দু ঠান্ডা অনুভূত হচ্ছে না। চারপাশটা হঠাৎই থমথমে, স্তব্ধ, গম্ভীর।
সবার সামনে চোখ বুজে আফনানের বুকে লুটিয়ে পড়া মেয়েটিকে দেখে সবাই যেন নিঃশ্বাস ফেলতেও ভুলে গেছে। কেউ কিছু বলছে না।
আফনান স্তব্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মেয়েটার মুখের দিকে। এত বছর ধরে যে মুখ সে দেখেনি, যে মুখটাকে মনে মনে ঘৃণা করেছে, অবজ্ঞা করেছে... আজ সেই মুখটাই তার সমস্ত ঘৃণার দেয়াল ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে।
—“জল... একটু জল আনো কেউ!”— হঠাৎ গলা ফাটিয়ে চিৎকার করল আফনান।
মিম দৌড়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে কাজের মেয়ে রুহিও ছোট্ট গ্লাসে জল নিয়ে এল।
আফনান জল ছিটিয়ে দিল মেয়েটার মুখে। হালকা আঁচলে মুখটা মুছে দিতে দিতে যেন অস্পষ্ট গলায় বলল—
—“এই তো আমি... এসেছি... তোমার সব অভিযোগের উত্তর দিতে এসেছি... এখন তো জেগে ওঠো... প্লিজ...”
হঠাৎ মেয়েটা চোখ খুলল। চোখে জল... অজানা ভয় আর ক্ষোভ মিশ্রিত চাহনি। ধীরে ধীরে উঠে বসল সে, কিন্তু আফনানের বুক থেকে নিজেকে ছাড়ায়নি।
—“আপনি কি সত্যি আমার...?”
মেয়েটার কণ্ঠ কাঁপছে।
—“হ্যাঁ... আমি আফনান নাওয়াফ মির্জা। তোমার স্বামী। যাকে তুমি আট বছর আগে শুধু একটা ছবিতে দেখেছিলে...”—কথাটা বলতে বলতে আফনানের চোখও জলে ভরে গেল।
ঘরে থাকা সবার চোখে জল। তবে একমাত্র রমিল চৌধুরী—রমনির বাবা—গম্ভীরভাবে দাঁড়িয়ে আছেন, চোখেমুখে কঠোরতা।
তিনি ঠাণ্ডা গলায় বললেন—
—“আপনার আবেগের অভিনয় শেষ হলে আমাদের জানাবেন। আমরা এসেছি ডিভোর্স পেপারে সাইন দিতে, নাটক দেখতে না।”
এই কথাটা শুনে ঘরটা আবারও স্তব্ধ হয়ে গেল। কিন্তু এবার আফনান থেমে থাকল না।
সে মেয়েটার হাত ধরে বলল—
—“তুমি চাইলে এখনই সাইন করে দিতে পারো। আমি থামাবো না। কিন্তু তার আগে শুধু একটা কথা বলো, এই আট বছরে কি একটাবারও আমার কথা মনে পড়েছে তোমার?”
মেয়েটা চুপ। কিছু বলছে না। তার চোখে অদ্ভুত এক অভিমান, কান্না আর ভালোবাসার মিশেল।
—“তুমি বলো না, আমি মরেই যাই।”— আফনান তার চোখে চোখ রাখল।
এই মুহূর্তে মেয়েটা বলল,
—“তুমি যখন ছিলে না, আমি প্রতিদিন একটা করে চিঠি লিখেছি তোমার নামে। পাঠাইনি, শুধু জমিয়ে রেখেছি একটা বাক্সে। যদি কোনোদিন ফিরো...”
আফনানের চোখ ছলছল করে উঠল।
রমিল চৌধুরী এবার আর সহ্য করতে পারলেন না। তিনি রেগে গিয়ে চিৎকার করলেন—
—“এত বড় নাটক! মেয়ে, উঠ! এখনই এই ছেলের হাত ছেড়ে আমার সঙ্গে চলো!”
কিন্তু এবার মেয়েটা রমিলের দিকে তাকিয়ে বলল—
—“বাবা, আজ আমি আর কোন নাটকে যাব না। আমার এই পুরোনো প্রেমের মানুষকে আমি নতুন করে খুঁজে পেয়েছি। আমি আর হারাতে চাই না।”
সবাই স্তব্ধ।
আফনান এগিয়ে গিয়ে তার স্ত্রীর কপালে আবারও স্নেহের চুমু একে দিল।
—“সখি, তুমি মোর হারিয়ে যাওয়া প্রেম... আজ থেকে আর হারাতে দিবো না।”
[চলবে...]

0 Comments