মির্জা বাড়ির রহস্য | দ্বিতীয় পর্ব


 

মির্জা বাড়ির রহস্য | দ্বিতীয় পর্ব
(ঘটনা – ২০১৮, চরভদ্রাসন, ফরিদপুর)

রাতের ঘটনার পর থেকেই আরিফ আর স্বাভাবিক থাকছে না। সারাক্ষণ মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে সেই রক্তমাখা লাশ, ঈশিতার রক্তাক্ত হাতে ধরা ছুরি আর তার অর্ধ নগ্ন ভেজা শরীরের দৃশ্য। সকালে বাবা-মার মুখের সামনে সে কিছু বলতে পারলো না, কিন্তু নিজের মনেই হাজার প্রশ্ন...

"আমি কি তাহলে ভুল দেখেছি?"
"কিন্তু সেই রক্ত, সেই লাশ... এত কিছু কল্পনা তো হতে পারে না!"

সকালে নাস্তার পরও ঈশিতা আরিফের দিকে এমনভাবে তাকিয়ে ছিল, যেনো গতরাতের সব কিছু সে জানে, কিন্তু কিছু না জানার অভিনয় করছে।

সেই দিন দুপুরে আরিফ একা একা ঘরের দরজা বন্ধ করে বসে থাকে। বিছানার নিচে লুকিয়ে রাখা সেই ডায়রিটা বের করে পড়া শুরু করে—


📓 মির্জা সিয়ামের ডায়রি (পাতা: ১২)
"আজ অনেক বড় একটা কথা লিখছি। ঈশিতার মাঝে কিছু একটা আছে। সে মাঝেমাঝে গভীর রাতে উঠে যায়। বৃষ্টি হলেই সে বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকতে ভালোবাসে। কিন্তু সে শুধু দাঁড়িয়ে থাকে না—কারো সঙ্গে ফিসফিস করে কথা বলে। আমি চুপিচুপি একদিন শুনেছিলাম। সে বলেছিল, ‘আমি তো কথা রেখেছি, এবার তুমিও কথা রাখো।’ আমি ভয় পেয়েছিলাম। মনে হলো কেউ যেন তার গায়ে ভর করে আছে।"

আরিফের বুক ধক ধক করে ওঠে। সে দ্রুত ডায়রির পাতা উল্টাতে থাকে।

📓 পাতা: ১৯
"গতকাল রাতে আমি ঈশিতাকে অনুসরণ করি। সে বাগানের পেছনের পুরনো কুয়োর পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো তার চোখ দুটো লালচে হয়ে উঠেছে। সে যেন কোনো মৃত মানুষের সাথে কথা বলছে। তারপর চোখ বন্ধ করে বলল— 'আরও একটি আত্মা চাই। এরপর আমি মুক্তি পাবো।' আমি আর সহ্য করতে পারলাম না। ফিরে আসলাম, কিন্তু ভয় পাচ্ছি। ঈশিতা আমার স্ত্রী, অথচ তাকে আমি যেন চিনতেই পারছি না।"

আরিফের চোখ ছানাবড়া। সে বুঝতে পারছে সিয়ামও ঈশিতা সম্পর্কে সন্দেহ করেছিল। কিন্তু... সে কি নিজের সন্দেহের বলি হয়েছিল?


সন্ধ্যার পরপরই হঠাৎ করে বিদ্যুৎ চলে যায়। পুরো বাড়ি অন্ধকারে ঢেকে যায়। মোমবাতি জ্বালানো হয়েছে। সেই অন্ধকারে ঈশিতা রান্নাঘর থেকে আরিফকে ডাক দেয়।

"আরিফ! তুমি একটু আসবে?"
তার গলা অনেক কোমল, কিন্তু আজ আরিফ সেই কণ্ঠে মোহ খুঁজে পায় না, পায় আতঙ্ক।

সে ধীরে ধীরে এগিয়ে যায় রান্নাঘরের দিকে। ঈশিতা তখন পিঁয়াজ কাটছিল। একটা হাত রক্তে ভিজে ছিল—
"ওহ এটা পিঁয়াজ কাটতে গিয়ে কেটে গেছে আরিফ। তুমি ভয় পাচ্ছো বুঝি?"
ঈশিতা তার দিকে তাকিয়ে হাসে।

আরিফ জবাব দেয় না। সে শুধু মাথা নেড়ে দ্রুত নিজের ঘরে চলে আসে। রাত বাড়তে থাকে। বাইরে আবার ঝিরঝির বৃষ্টি পড়ছে। হঠাৎ ঘরের জানালার পাশে ছায়াময় একটা চেহারা ভেসে ওঠে।

আরিফ চিৎকার করতে যাবে, তখনই জানালার কাঁচে ঠক ঠক আওয়াজ—
"আরিফ! দরজা খোলো। আমি তোমার ভাই সিয়াম।"

আরিফ কাঁপতে থাকে। সে মনে মনে ভাবছে,
"ভাইয়ের তো মৃত্যু হয়েছে... তাহলে এই গলাটা কার?"

সে ধীরে ধীরে দরজার দিকে এগিয়ে যায়...
হাত বাড়িয়ে দরজার হাতলে ছোঁয়া মাত্রই দরজার বাইরে থেকে কেউ চাপ দিয়ে খুলে ফেলে দরজাটা!

একদম সামনে দাঁড়িয়ে আছে –
মির্জা সিয়াম!

কিন্তু তার গায়ে কাদা, গলা কাটা, চোখে শূন্য দৃষ্টি!
আরিফ পেছনে সরে আসে। মাথা ঘুরে পড়ে যায় বিছানায়।

ঘরের ভিতর আবার ঢুকছে ঈশিতা। তার মুখে এখন আর সেই কোমলতা নেই। ঠোঁটে বাঁকা হাসি, হাতে সেই পুরনো ছুরি।

"আমি তো বলেছিলাম, আরও একটি আত্মা চাই!"

আরিফের চিৎকারে কেঁপে উঠে পুরো বাড়ি…

চলবে…



Post a Comment

0 Comments